সে যাই হোক, এরপর ফিরতেই হলো; ফিরতেই হলো।
শাকসবজি কিনতে এখন আর ভুল হয় না তেমন।
শুনছো কি তুমি? একসময় হতো, এখন আর হয় না—
পটল, পেঁপে, গাজর—সব বেছে বেছে, এমন হিসেব করে তো
ভালোবেসেছিলাম তোমাকেই!
সে যাকে ফিরতে হচ্ছে বাড়ীতে, তরকারির অপেক্ষায় তো কেউ আছে বসে,
আমিই কণ্ঠকে রুদ্ধ করে রেখেছি; আমার কান দুটোও আর কাউকে শুনতে চায় না।
জানো, এখন আর আমাকে জীবিত মনে হয় না— মৃত মনভাহী শকট মনে হয়। মানুষের সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে, বড্ড ভয় হয় আজকাল।
আমার অনেক না পাওয়া এ জীবনে—কেমন করে যেন ঈশ্বর তোমাকে দিয়েছিলেন!
নিরবিচ্ছিন্ন আঁধারের মাঝে তুমি ছিলে আমার আলোকবিন্দু, আমার অভয়া।
তুমি যখন সাজতে বসলে, আমি তখন মুগ্ধ বালক; ব্যস্ত আমি—খুঁটির সাথে আট ইঞ্চির আয়নাটা হেলান দিয়ে রেখে চুলে চিরুনি চালাই।
তোমাকে তেমন কিছুই মাখতে দেখিনি, তারপরও তুমি অনিন্দ্য; বিশেষ দিনে মাঝেমধ্যে টিপ পরো, শুধু।
তুমি ছিলে আমার আশ্রয়স্থল, আমার কল্পতরু।
আজকাল যেন মনে হয় আমি শুধু নিঃস্ব এক দ্বীপ—ডুবতে ডুবতে জেগে আছি।
আহ্, সেই সময়, সেই দিন—দেবীর করুণায় বেঁচে আছি; তাকে অন্তত কিছু অর্ঘ্য দিতে পেরেছি।
তুমি বলেছিলে—সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখো; আমি কি প্রতিদিন এটা করতে পারব? আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলাম—আমার জীবনই তো ছড়ানো ছিটানো।
তবে আমি এখন সবজি কিনতে শিখে গেছি;
এখন আর টাটকা-বাসি চিনতে হয় না ভুল।
শহরে হররোজ ঘোরার অভ্যাস চুকে গেছে;
আমি—আমি ব্যস্ততা বলতে সংসার বুঝি।
ওহ হ্যাঁ, শেষ চিঠিটা আর পড়া হয় নি; দুচোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিলো—
হয়তো খুলে দেখার সাহস পাইনি। নিজেকে আজ প্রশ্ন করি—এমন অসহায় মানুষ আমি জীবনে আর দেখিনি।
এমন নিঃসঙ্গ, নিঃস্ব জীবন; এমন হতচ্ছাড়া জীবন;
এমন কাঙালপনা জীবন—কেন আমার?
তোমাদের আর আমাদের ঘর পাশাপাশি; মাঝে শুধু উঠোন।
উঠোন পেরিয়ে আজ তোমাকে ছুঁতে দূর—বহুদূর।
ভেবেছিলাম একদিন সব বলব, কিন্তু কিছুই বলা হচ্ছে না।
পৃথিবীতে কেউ কেউ একা থাকে—তবে আমার মতো এমন নিঃসঙ্গ আর কী কেউ আছে?
আজকাল অনেক কাজের তাড়া—অফিস, বাড়ি ফেরা, কারেন্ট বিল;
অর্ধাঙ্গিনীর হিসেব-সমেত বাজারের ফর্দ মিলিয়ে আনা।
আমার যন্ত্রণার কথা, বেদনার কথা, আনন্দের ক্ষণ, সুখের মুহূর্ত—আর কাউকে বলা হয় না; এটা কত বড় একাকিত্ব, তুমি অনুধাবন করতে পার?
তোমার জন্যে কেনা শাড়িটা আর দেয়া হয়নি;
অথচও আমি ভেবেছিলাম—বিজয়ার দিনে তুমি এটা পরবে।
ভেবেছিলাম তুমি বলবে, “তুমি এটা যত্ন করে রেখে দাও; তোমার বউ হয়ে এলে তখন পরব, তখন আমাকে আরও কিনে দিও।”
একটা সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলাম—জানো, আমি আর তুমি।
তোমার সাথে আমার, আমার সাথে তোমার সংসার করা হলো না;
তবে হয়েছে—আমি তাকে সংসার নয়, কর্তব্যপথ বলি;
আমি পালন করে যাই—করে যেতে হয়।
দিনশেষে অবশিষ্ট আমার জন্যে থেকে যায় শুধু আমি,
আর একটা ঘর—যে ঘরে ঘুমাই, সে ঘরে ঠাণ্ডা করার মেশিন লাগানো।
তবুও আমার দমবন্ধ লাগে; গা জ্বালা করে, ঘুমাতে পারি না। আমার চুপসে যাওয়া মুখটা আয়নায় দেখি।
আর্তনাদের শহরের দেয়াল জুড়ে তোমার ছবি;
নিঃঘুম রাত কাটে তোমাকে ভেবে—আজও কানে বাজে তোমার নূপুরের শব্দ!
তোমার চুলের বাতাস এসে পড়ে নিশ্চয়ই আজও আমার মুখে!
আচ্ছা, এই যে আমি নিরন্তর একলা জাগি—
মাঝরাতে স্মৃতি ঘেঁটে কবি হয়ে উঠি!
সেদিন প্রেমে, আর আজ প্রেমহীনতার প্রহর কাটি।
আমার বোধ হয় মানুষ হয়ে ওঠা হয়নি—না?
তটিনী, তুমি জানো, আমি কেমন আছি?
তোমার কী তা জানার উপায় নেই?
আমার পেঁপের গাছে ফুল এসেছে; উঠানের রক্তজবা রোজ একটা পাখি কাকে যেন ডাকে;
ভেবেছিলাম, তুমি চলে গেলে এইসব ফুলপাখি মরে যাবে অগণন তৃষ্ণায়!
শুনে কি এ কথা কাঁদে প্রকৃতি—তুমি চলে গেলে তবে থামে পৃথিবী?
আকাশ ভেঙে পড়ে মাথায় আমার; কবে কার তুমি—যেন হৃদয় মাঝার।
আমার তরে কী হবে এমন একদিন?
অবসরে ভেবে নিবে আমাকে রঙিন!
আমাকে ফেলে কোথায় গেলে—দূরে তোমার চুলে হারিয়েছিলাম,
যেমন নাবিক সমুদ্রের মধ্যে।
কিন্তু তা হয় নাকি? তাও বাঁচে আছি আজও—নিঁখোজ একাকী;
পালন করছি একটি পাথুরে ধর্ম, যাকে সংসার বলা হয়।
আমি ছিলাম তোমাতে—প্রচ্ছন্ন; তুমি আমাতে—প্রকট।
আমি জানি—কোন এক জন্মে, ক্ষেত্র বিচার না করেই, একদিন তা প্রকাশ পাবে।
আর আমি? না? শুনলে! আমি আমাতে অসংখ্য বার তোমাকে সৃজন;
আমি বারংবার মরি তোমার নামে।
এজন্মে তোমাকে না পেলে—পরের জন্মে তোমার নাছোড়বান্দা প্রেমিক হব।
১০/০৬/২৩
পরের জন্মে যদি দেখা হয়েই থাকে
দেখা হবার বছর দশেক পর (সিক্যুয়াল)
রাজীব সত্যান্বেষী